Menu Close

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ও অগমেন্টেড রিয়েলিটি কি? বিস্তারিত!

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ও অগমেন্টেড রিয়েলিটি

আমরা এতদিন যাবৎ ভার্চুয়াল রিয়েলিটির কথা শুনে এসেছি। তাই ভার্চুয়াল রিয়েলিটি সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই কম-বেশি ধারণা আছে। কিন্তু অগমেন্টেড রিয়েলিটি এসেছে বেশিদিন হয়নি। দুটোর মধ্যে যেমন মিল আছে, ঠিক তেমন আকশ-পাতাল অমিলও রয়েছে। আমরা আমাদের আজকের পর্বে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি এবং অগমেন্টেড রিয়েলিটি নিয়ে আলোচনা করব। আসুন শুরু করা যাক।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (VR) সম্পর্কে বিস্তারিত

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি হচ্ছে বাস্তবের চেতনা উদ্রেককারী কল্পনা, যা বাস্তব নয়। সহজ ভাষায় মনে মনে কলা খাওয়ার নামই হচ্ছে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি।

কম্পিউটার গ্রাফিক্স দিয়ে তৈরি বাস্তবের মতো কৃত্রিম জগত হলো VR. বিশ্বের যেকোন পরিবেশ বা জিনিস কম্পিউটার গ্রাফিক্স ব্যব্যহার করে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি তৈরি করা সম্ভব। এককথায় ভার্চুয়াল রিয়েলিটিতে আপনি বাস্তবের চাওয়া-পাওয়া অবাস্তব দিয়ে পূর্ণ করতে পারবেন।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটিতে আপনি কৃত্রিমভাবে তৈরি জগতে যা ইচ্ছা তাই করতে পারবেন। কেননা বাস্তব কে হুবহু নকল করেই কৃত্রিম পরিবেশে রুপদান করা হয়। অতএব বাস্তবের সাথে মিল রেখে কল্পনার জগত তৈরি করে বিচরণ করাই হচ্ছে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি- VR
ভার্চুয়াল রিয়েলিটি- VR

ভার্চুয়াল রিয়েলিটিতে কি কি প্রয়োজন?

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি উপভোগ করতে সবার আগে প্রয়োজন কম্পিউটার গ্রাফিক্সের তৈরি কৃত্রিম দুনিয়া। আর সেই কৃত্রিম দুনিয়া তৈরি করতে মোটামুটি খরচ পরে। বাজারে বিভিন্ন ধরনের ভার্চুয়াল রিয়েলিটির সফট কপি কিনতে পাওয়া যায়। অতএব ভার্চুয়াল রিয়েলিটি উপভোগ করার জন্য আপনাকে প্রথমে যেকোনো সফট কপি প্রোগ্রাম কিনতে হবে।

তারপর হেড মাউন্টেড ডিসপ্লে, ডাটা আউটপুট রিলেটেড যন্ত্রপাতি এবং বিভিন্ন সিমুলেশন ইত্যাদির মাধ্যমে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি উপভোগ করতে পারবেন।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটির পেছনে বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশগুলো প্রচুর অর্থ ব্যয় করছে।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটির ব্যবহার ও উপকারিতা

ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মাধ্যমে আপনি বিভিন্ন কিছু শিখতে পারবেন। যেমন – গাড়ি চালানো শেখা, বিমান চালানো শেখা ইত্যাদিসহ যেকোন কিছুর অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারবেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির সাহায্যে নতুন পাইলটদের বিমান চালানো শেখানো হয়। এছাড়াও চিকিৎসা ক্ষেত্রে নব্য ডাক্তারদের বিভিন্ন অস্ত্রোপচার শেখানোর কাজে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ যেসব কাজ আপনি আগে কখনো করেননি, ভার্চুয়াল রিয়েলিটির সাহায্যে সেসব কাজ করার অভিজ্ঞতা পাবেন।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটির অপকারিতা কী?

ভার্চুয়াল রিয়েলিটির সবচেয়ে বড় অসুবিধা হচ্ছে এটি ব্যবহারে মোটামুটি খরচ হয়। বিশেষ করে বিভিন্ন থ্রি ডি প্রোগ্রামিং কিনতে খরচ পড়ে। আমাদের মত সাধারণ মানুষের পক্ষে হয়তো ভার্চুয়াল রিয়েলিটির অভিজ্ঞতা নেওয়া খুব কমই সম্ভব।

অন্যদিকে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির কারণে দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি লোপ পেতে পারে। এছাড়াও ভার্চুয়াল রিয়েলিটির জন্য সামাজিক সম্পর্ক খারাপ হতে পারে। কারণ ভার্চুয়াল রিয়েলিটির ফলে মনুষ্যত্ব হ্রাস পায়।

উদাহরণ হিসেবে ধরুন – একজন ব্যাক্তি যে সারাক্ষণ মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যাবহার করে, তার কিন্তু বন্ধু-বান্ধব অনেক কম। কারণ সে ল্যাপটপ বা মোবাইলের নেশায় আসক্ত। সেরকমভাবে ভার্চুয়াল রিয়েলিটিও হচ্ছে এক ধরনের প্রবল নেশা। যার একবার নেশা হয়ে যায়, সে সহজে ছাড়তে পারবে না। যার কারণে মানুষের প্রতি মানুষের সম্পর্ক খারাপ হয়ে যেতে পারে।

অগমেন্টেড রিয়েলিটি (AR) নিয়ে বিস্তারিত

অগমেন্টেড রিয়েলিটি হচ্ছে বাস্তব জগতের কল্পনা। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ছিলো শুধু কম্পিউটার গ্রাফিক্স দিয়ে তৈরি। কিন্তু অগমেন্টেড রিয়েলিটি হচ্ছে বাস্তবের সাথে কল্পনা মিশেয়ে তৈরি। আপনি নিজের চোখে যা দেখবেন, তার ওপর AR প্রযুক্তি ব্যবহার করে কল্পনা করাই অগমেন্টেড রিয়েলিটি। বাস্তব পরিবেশের সাথে আপনি যা দেখতে চাইবেন অগমেন্টেড রিয়েলিটি আপনাকে তাই দেখাবে।

অগমেন্টেড রিয়েলিটি (AR)
অগমেন্টেড রিয়েলিটি- AR

আসুন কিছু উদাহরণ এর সাহায্য অগমেন্টেড রিয়েলিটি বোঝা যাক।

***ধরুন, আপনি বাইক নিয়ে রাস্তায় বের হলেন। বাইক চালাতে চালাতে জ্যামে আটকা পড়লেন। ঠিক তখনই মোবাইল বের করে সামনে ধরলেন, আর নিজের জায়গাটা কল্পনা করতে লাগলেন। আপনার মোবাইল আপনার কল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে লাগলো।

কল্পনায় আপনার সামনে থেকে সবগুলো গাড়ি উধাও হয়ে গেলো। আর আপনি বাইক নিয়ে সাই করে টান মারলেন। এটা কিন্তু পুরোটাই কম্পিউটার ভিত্তিক বাস্তব দুনিয়ার কল্পনা ছিল। বাস্তবে কেউ বাইক নিয়ে শাই করে টান মারিয়েন না…

***তারপর ধরুন আপনি কোন জায়গায় বেড়াতে গেলে। সেখানে দেখতে পেলেন কিছু ফাঁকা জায়গা পড়ে আছে। সেই ফাঁকা জায়গায় কিছু গাছ-গাছালি থাকলে সুন্দর লাগতো। অগমেন্টেড রিয়েলিটির সাহায্যে আপনি সেখানে কল্পনায় গাছ লাগিয়ে দিতে পারবেন এবং সাথে কিছু গরু-ছাগলও বসিয়ে দিতে পারবেন। আপনি এই পরিবেশে কিছু ঘর-বাড়িও তৈরি করে দিতে পারবেন।

***মনে করুন, আপনি এখন মিরপুর ক্রিকেট স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে গিয়েছেন। বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তান ক্রিকেট খেলা চলছে। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা ভালো মারার সুযোগ পাচ্ছে না। আপনি তখন অগমেন্টেড রিয়েলিটির সাহায্যে কল্পনায় পাকিস্তানের বোলিং এবং ফিল্ডিং বলেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের উপযোগী করে দিতে পারেন। কীভাবে উপযোগী করবেন, কমেন্টে জানান…

অগমেন্টেড রিয়েলিটিতে কি কি প্রয়োজন?

বাস্তব জগতের সঙ্গে কৃত্রিম শব্দ, ভিডিও গ্রাফিক্স, ইনপুট ও আউটপুট ডিভাইস, স্পর্শ করার অনুভূতি বা মোশন ইত্যাদি ব্যবহারের মাধ্যমে অগমেন্টেড রিয়েলিটি তৈরি হয়। AR বা অগমেন্টেড রিয়েলিটি প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত হয় ডিসপ্লে গ্লাস, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রসেসর, জিপিএস, বিভিন্ন ধরনের সেন্সর, ভালো মানের ক্যামেরা ইত্যাদি।

এখন আপনি হয়তো ভাবছেন যে, মোবাইলে কি অগমেন্টেড রিয়েলিটি অভিজ্ঞতা লাভ করা সম্ভব? হ্যাঁ সম্ভব। AR সুবিধা আছে, শুধুমাত্র সেসব ফোনে করা সম্ভব। যেমন – আইফোন ৮, এবং আইফোন ১০ ইত্যাদি।

ধরুন, আপনার কাছে প্রয়োজনীয় সকল ডিভাইস আছে। তখন সর্বপ্রথম আপনার ক্যামেরা এবং সেন্সর চালু হবে। আপনার সামনের বাস্তবের জিনিসসমূহ দেখাবে ক্যামেরা। আর আপনার বাস্তব দুনিয়ার সব আলো এবং আপনার নড়াচড়া অনুভব করবে মোশন সেন্সর। তারপর বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে আপনি অগমেন্টেড রিয়েলিটির অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারবেন।

অগমেন্টেড রিয়েলিটির ব্যবহার বা প্রয়োগ

আমাদের দেশে এবং দেশের বাইরে অগমেন্টেড রিয়েলিটি ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে। সামরিক বাহিনীতে AR ব্যবহার করে বিভিন্ন ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে। অ্যাপস ডেভলপাররা AR ভিত্তিক অ্যাপস তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। গেমস দুনিয়ায় পোকেমন গো (Pokemon Go) হচ্ছে সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড করা AR ভিত্তিক গেমস।

আর আমাদের দেশে অগমেন্টেড রিয়েলিটি উপর ভিত্তি করে ‘১৯৫২’ নামের একটি অ্যাপস তৈরি করা হয়েছে। অ্যাপসটি বিনামূল্যে ইন্টারনেটে পাওয়া যাবে। অ্যাপসটি ডাউনলোড করে চালু করার পর, দুই টাকার নোটের শহীদ মিনারের উপরে ক্যামেরাটি ধরুন। দেখবেন চমৎকার ব্যাপার ঘটছে।

অগমেন্টেড রিয়েলিটি উপকারিতা

অগমেন্টেড রিয়েলিটি ব্যবহার সৃজনশীলতা বাড়ানো সম্ভব। শিক্ষাক্ষেত্রে অগমেন্টেড রিয়েলিটি, ভার্চুয়াল রিয়েলিটির থেকেও বেশি কাজে আসবে। বাস্তব জগতের প্রতি মানুষের কল্পনা শক্তি বাড়বে। এক কথায়, বাস্তব জগতের এক অসাধারণ বিপ্লব আনবে অগমেন্টেড রিয়েলিটি।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি Vs অগমেন্টেড রিয়েলিটি

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ও অগমেন্টেড রিয়েলিটির মাঝে কিছু গুরত্বপূর্ন বিষয় বিবেচনার রয়েছে যার মাধ্যমে আপনি খুব সহজেই একটা বেসিক ধারনা পাবেন দুইটার তফাৎ এর।

  • ভার্চুয়াল রিয়েলিটি হচ্ছে মূলত একপ্রকার ঢোকা। কারণ ভার্চুয়াল রিয়েলিটির সবকিছুই কম্পিউটার গ্রাফিক্স কর্তৃক কৃত্রিম দুনিয়া।
  • অগমেন্টেড রিয়েলিটি হচ্ছে বাস্তব দুনিয়ার সাথে কল্পনা জগতের প্রলেপ। অর্থাৎ বাস্তব জগতকে সৃজনশীল বা পরিবর্ধন করে দেখা।
  • ভার্চুয়াল রিয়েলিটি সম্পূর্ণ কৃত্রিম হওয়ায়, সেখানে গভীরভাবে প্রবেশ করা যায় না।
  • কিন্তু অগমেন্টেড রিয়েলিটিতে বাস্তবের সাথে কল্পনার মিল থাকার কারণে, এক ভিন্ন রকম দুনিয়ার প্রবেশ করা যায়।
  • ভার্চুয়াল রিয়েলিটির প্রযুক্তির তুলনামূলকভাবে সস্তা,
  • কিন্তু অগমেন্টেড রিয়েলিটির প্রযুক্তি অনেক দামি।
  • ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ব্যবহৃত হয় থ্রিডি দুনিয়া উপভোগের জন্য,
  • অন্যদিকে AR ব্যবহার হয় বাস্তব দুনিয়ায় নতুন কিছু আবিষ্কারের জন্য।
  • গুগোল কার্ডবোর্ড, স্যামসাং গিয়ার ভি হচ্ছে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির উদাহরণ।
  • মাইক্রোসফট হলো লেন্স, গুগোল গ্লাস ইত্যাদি হচ্ছে অগমেন্টেড রিয়েলিটির উদাহরণ।

শেষকথা

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি এবং অগমেন্টেড রিয়েলিটি সম্পর্কে আজকের পর্ব আপনার অনেক কিছু জানতে পেরেছেন। আমরা সবসময় সহজ ভাষায় সবকিছু বোঝানোর চেষ্টা করি। যদি আপনাদের AR এবং VR সম্পর্কে কোনোকিছু জানার থাকে, তাহলে কমেন্ট করে জানান।

Related Posts